ব্যাংকিং পেশায় তরুণদের ক্যারিয়ার

0
21

আহমাদ মুন্না

সার্বিক বিবেচনায় ব্যাংকিং পেশা একটি চমৎকার পেশা। এ পেশায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি নিজের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এমনকি এ পেশায় নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিমাপ করা যায়। এসব কারণে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার এখন অনেক মেধাবীর স্বপ্ন। আর এ স্বপ্ন বুননে আপনাকে দিতে হবে মেধা ও মননশীলতার পরিচয়। সুতরাং ব্যাংকিং পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আপনাকে কি কি করতে হবে এ নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আহমাদ মুন্না

পেশা হিসেবে ব্যাংকে চাকরি

প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এদেশে বেকার সমস্যা একটি প্রকট সমস্যা। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৩৮ ভাগ বেকার। এর মধ্যে প্রায় দেড় কোটি শিক্ষিত বেকার। বেকার সমস্যা দূরীকরণের জন্য প্রয়োজন অধিক কর্মসংস্থান। নব্বই দশকের পর বাংলাদেশে একটি বিকাশমান কর্মসংস্থান হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে সদ্য অনুমোদন পাওয়া নয়টি ব্যাংকসহ বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৫৬টি। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংক ৪টি। বাকি ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে বেসরকারি ৩৯টি, বিশেষায়িত ৪টি ও বিদেশী ৯টি ব্যাংক রয়েছে। সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ব্যাংক আর শাখা। আর এসব ব্যাংকের দেশব্যাপী শাখার সংখ্যা প্রায় সাড়ে নয় হাজার। বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রসারের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেরও প্রসার ঘটেছে। যেখানে প্রতিবছর কর্মসংস্থান হচ্ছে বহু শিক্ষিত বেকার যুবকের। ব্যাংক একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। জনতা ব্যাংকে সদ্য চাকরি পাওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী তরুণ সুমন হোসেন জানান, অধিক বেতন আর সুন্দর ও সচ্ছল জীবন-যাপনের আশায় আজ দেশের বহু শিক্ষিত যুবক পেশা হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান তথা ব্যাংককে বেছে নিতে শুরু করেছে।

প্রয়োজনীয় যোগ্যতা

ব্যাংকিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলে আপনার কতগুলো যোগ্যতা থাকতে হবে। যথা- শিক্ষাগত যোগ্যতা। যে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট হলে ব্যাংককে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ থাকবে, তবে বিশেষ করে বিবিএ ও এমবিএ (হিসাব বিজ্ঞান, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি) ডিগ্রি থাকলে বর্তমানে ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার জন্য সুবিধা হয়। তবে বিশেষ কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলে যে কোনো বিষয়ে পাস করে ব্যাংকে চাকরির জন্য আবেদন করা যেতে পারে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংগুলোতে অফিসার ও সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগ সব বিষয়ের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে টেকনিক্যাল পোস্টে আইটি খাতে নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ থাকতে পারে। আর বেসরকারি ব্যাংগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবিএ, এমবিএ করা ছাত্রদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকালটির প্রফেসর অধ্যাপক মুজিব উদ্দিন আহমেদ বলেন, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ব্যাংক পেশায় আসা সবার কম্পিউটারের ওপর ব্যাপক দক্ষতা থাকা উচিত। কারণ ব্যাংকের লেনদেন থেকে শুরু করে সব কিছুই কম্পিউটার (অন-লাইন) ভিত্তিক। বলা যেতে পারে বর্তমানে আমরা, ই-ব্যাংকিংয়ের যুগে বসবাস করছি।

যোগদান, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতা

ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আধুনিক ধারার ব্যাংকে সাধারণত বিনিয়োগ, করপোরেট ব্যাংকিং, প্রশাসন ও তদারকি, বিপণন জনসংযোগ ইত্যাদি বিভাগ থাকে। বিভাগ পরিচালনার জন্য থাকেন একজন বিভাগীয় প্রধান। কার্যক্রমের সঙ্গে বিভাগের কাজ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লোকের চাহিদাও। ব্যাংকগুলো প্রথম সারির কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য সাধারণত ব্যবস্থাপনা শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা (এমটিও) প্রিঞ্চিপাল অফিসার (পিও), শিক্ষানবিশ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (টিএসও) বা ট্রেইনি অফিসার (টিও) পদে আবেদন আহ্বান করা হয়। তবে কোনো কোনো ব্যাংক আবার জুনিয়র অফিসার, অফিসার ইত্যাদি পদে নিয়োগ প্রদান করে থাকে। শিক্ষানবিশকাল শেষে এমটিওকে ফার্স্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার, পিওকে এক্সিকিউটিভ অফিসার এবং টিএসওকে সিনিয়র অফিসার এবং টিওকে অফিসার হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ দেয়া হবে। এছাড়া মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার বলে একজন প্রথম সারির কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে এভিপি, ভিপি, এসভিপি হয়ে পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে তিনি উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এমনকি ব্যবস্থাপনা ?পরিচালক (এমডি) পর্যন্ত হতে পারেন। নির্দিষ্ট মেয়াদ পেরোলে কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির মেয়াদ, পেশাগত দক্ষতা, ব্যাংকিং জ্ঞান বিবেচনা করে পদোন্নতি দেয়া হয়। বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের কর্মকর্তাদের চাকরি শুরুর দিকে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার আর ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনিদের ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দিয়ে থাকে। জ্যেষ্ঠ নির্বাহী স্তরে অর্থাৎ অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের বেতনক্রম প্রায় ৬০ হাজার থেকে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা হয়ে থাকে।

পছন্দের শীর্ষে ব্যাংক

বর্তমানে চাকরির ক্ষেত্রে তরুণদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ব্যাংক। আর এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। কারণ চাকরিতে কর্পোরেট হাউজগুলো মেয়েদের অধিক পছন্দ। এক হিসাবে দেখা যায়, গত বছর সোনালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার, অফিসার ও অফিসার (ক্যাশ) পদে ১ হাজার ৭০৭টি পদের বিপরীতে নিয়োগের আবেদন জমা পড়ে ২ লাখ ২০ হাজার। একই বছরে জনতা ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার-টেলর (ক্যাশ) পদের ৬৪৮ পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার। গতমাসে কৃষি ব্যাংকে ১ হাজার ১৭৩টি পদে বিভিন্ন গ্রেডে নিয়োগ ছাড়া হয়, এখানেও প্রায় আড়াই লাখ আবেদন জমা পড়বে বলে মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য মাস্টার্স পাস করা অর্থনীতি বিভাগের মেধাবী ছাত্র গাজী আল আমিন। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থাও একই রকম।

সফলতার সিঁড়ি

সোনালী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান আশরাফ উল্লাহ বলেন, সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়া যায়। সরকারি ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা বিষয় উল্লেখ থাকে না বলে এখানে সবাই চাকরির সুযোগ পায়। আর ব্যাংকে চাকরি করে আপনি ধাপে ধাপে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারেন অতি সহজে। মূলত ব্যাংকের চাকরির ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার এ ব্যাংকে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে। এখন তিনি ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ফরমান আর চৌধুরী ১৯৮৬ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে, এখন তিনি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। আবদুল মান্নান ইসলামী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) হিসেবে, এখন তিনি ব্যাংকটির প্রধান ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী গোলাম আহমেদ ১৯৮৩ সালে পূবলী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এছাড়াও মো. হাবিবুর রহমান ১৯৭৮ সালে সোনালী ব্যাংকে প্রবেশনারী অফিসার হিসেবে যোগদান করে এখন তিনি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সুতরাং বুঝতেই পারছেন ব্যাংকেই রয়েছে আপনার সফলতার উজ্জ্বল হাতছানি।