চার্টার্ড একাউন্টেন্সি : একটি সম্ভাবনাময় পেশা

0
17

মুহাম্মদ রিয়াজুল কবির

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, A Chartered Accoutant’s signature is more powerful than a Prime Minister’s signature. বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের চৌকস একজন প্রধানমন্ত্রীর এমন উক্তি এই পেশা সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহ আর আলোচনার সূচনা করেছে।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে পঞ্চাশের দশকে মর্যাদাসম্পন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ এই পেশার বিকাশ ঘটেছে। সেই সময় বাংলাদেশের অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের কারখানা ও সদর দফতর চট্টগ্রামে অবস্থিত ছিল। যার ফলে চট্টগ্রামেই বেশির ভাগ চার্টার্ড একাউন্টেন্সি ফার্মগুলো তাদের অফিস স্থাপন করেছিলেন। বহু সংখ্যক খ্যাতনামা চার্টার্ড একাউন্টেন্ট চট্টগ্রামের সন্তান ছিলেন বা এখানকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিলেন, মরহুম এম.আর. সিদ্দীকী, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মরহুম জামাল উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশের বৃহত্তম অডিট ফার্মের অংশীদার মরহুম মোসলেহ উদ্দিন, মরহুম এম এ বারী, আলতাফ হোসেন সিদ্দীকী।

এই চট্টগ্রামেই বাংলাদেশের অন্যতম বাঙ্গালী মুসলিম চার্টার্ড একাউন্টেন্ট মরহুম এ. কাশেম তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ফার্ম কে পি এম জি রহমান রহমান হকের সুচনা এই চট্টগ্রাম থেকেই। বর্তমানেও অনেক চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেছিলেন, দেশের অভ্যন্তরে আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এদের মধ্যে বিএসআরএম গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান আলী হোসাইন আকবরআলী, জিপি আইটির সাবেক প্রধান নির্বাহী, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কনফিডেন্স সল্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জিপি এইচ ইস্পাতের নির্বাহী পরিচালক, আবুল খায়ের শিল্প গোষ্ঠির ডিরেক্টর অন্যতম। মহিলাদের মধ্যে মিসেস পারভীন মাহামুদ, ইয়াসমীন সফদর আলি, সুরাইয়া জান্নাত, রত্না দে অন্যতম।

চট্টগ্রাম হতে অতীতে ও সাম্প্রতিক সময়ে বহু প্রতিভাবান চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হলেও, সম্ভাবনাময় এই মহান পেশা সম্পর্কে আমাদের শিক্ষার্থীরা নানা ভুল ধারণা পোষণ করেন। হিসাব, অডিট, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নানা পেশাতেই চার্টার্ড একাউন্টেন্টদের কদর বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের সনদপ্রাপ্ত চার্টার্ড একাউন্টেন্টগণ বিদেশের বিভিন্ন দেশেও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন। এর কারণ হলো, সিএ এর সিলেবাস ও পড়ালেখার ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিকমানের। বাংলাদেশে সিএ পড়ার ও সনদ প্রদানের পুরো ব্যবস্থাপনা Institute of Chartered Accountants of Bangladesh (ICAB) পরিচালনা করে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন হিসাব বিজ্ঞান ও পেশাদারী বিষয়ে South Asian Federation of Accountants (SAFA), International Federation of Accountants (IFAC), Institute of Chartered Accountants of England and Wales (ICAEW), CPA Ireland, Chartered Accountants World Wide ইত্যাদির সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ার করে থাকে, যার ফলে সিএ তে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে।

সিএ এর একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর নিবন্ধিত ছাত্ররা, অধ্যয়নকালে বিভিন্ন কোম্পানিতে শিক্ষানবীস নিরীক্ষক হিসাবে কাজ করে হিসাব সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করে থাকেন। সে সময় তাদেরকে কোন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট ফার্মের একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্টের অধীনে শিক্ষানবীস হিসাবে থাকতে হয়। একই সময় তারা আইসিএবি কর্তৃক আয়োজিত পরীক্ষাতেও অংশ নেন। মূলত এইসব পরীক্ষায় পাস করে এবং তিন বছরের নির্ধারিত শিক্ষানবীস কোর্স সম্পন্ন করলে একজন ছাত্র চার্টার্ড একাউন্টেন্ট বা সনদপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক হতে পারেন। কোর্সটি মূলত তিন বছরের হয়ে থাকে এবং প্রতি ছয় মাস পর পর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা যায়। পরীক্ষাগুলো মূলতঃ তিনটা পর্যায়ে বিভক্ত। knowledge Level, Application Level, Advance Level সর্বমোট এখানে ১৮টা বিষয় রয়েছে। একজন ছাত্র একটা লেভেলের যে কটি সাবজেক্টে ইচ্ছা, পরীক্ষা দিতে পারে এবং যে কটিতে সে পাস করবে, সে কটিই পাস হিসাবে বিবেচিত হবে। প্রয়োজনীয় বই, পুরাতন প্রশ্ন পত্র, পুরাতন প্রশ্নের উত্তরপত্র ইত্যাদি আইসিএবি–এর আগ্রাবাদস্থ অফিসে পাওয়া যায়। এছাড়া আইসিএবি কর্তৃক ছাত্রদের জন্য নিয়মিত কোচিং ক্লাস ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এর বাইরে প্রতিটি সিএ ফার্ম তার নিজস্ব শিক্ষানবীসদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেন। প্রতিটি ফার্ম, তার শিক্ষানবীস ছাত্রদের আইসিএবি কর্তৃক নির্ধারিত ভাতা প্রদান করে থাকেন।

শিক্ষানবীস থাকাকালীন, ছাত্রদেরকে বিভিন্ন কোম্পানিতে অডিট, ট্যাক্স, কন্সালটেন্সি সংক্রান্ত কাজে পাঠানো হয়ে থাকে। তাদের কাজ সরাসরি চার্টার্ড একাউন্টেন্সি ফার্মের মালিক বা ম্যানেজার যিনি একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হন, রিভিউ করেন। এভাবে করে একজন শিক্ষানবীস ছাত্র কাজ শিখেন। যখন তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন, তখন অতি সহজেই হিসাব সংক্রান্ত সমস্ত কাজ, ট্যাক্স, অডিট, কোম্পানির সেক্রেটারিয়াল কাজ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত কার্যাবলী সামলাতে পারেন।

সঙ্গতকারণেই চার্টার্ড একাউন্টেন্টগণের চাহিদা এবং আর্থিক সুবিধা অন্যদের তুলনায় বেশী। একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, যে কোন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শাখার প্রধান, একজন নিরীক্ষক, Financial Analyst, Investment Manager, CEOহিসাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রম বর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে চার্টার্ড একাউন্টেন্টের ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেবাস আধুনিকীকরণ, ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও কোচিং এর ব্যবস্থা করা, সিএ সংক্রান্ত বইয়ের সহজপ্রাপ্যতা পাসের হার বৃদ্ধি করছে।

লেখক : বিএসআরএম গ্রুপে কর্মরত