চাকরির ‍জন্য আকর্ষণীয় জীবনবৃত্তান্ত কিভাবে বানাবেন ?

0
25

জীবনবৃত্তান্ত হচ্ছে একজন সম্ভাব্য চাকুরীদাতার কাছে একজন চাকুরীপ্রার্থী হিসাবে উপস্থাপন করার প্রাথমিক মাধ্যম ৷ কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় চাকুরীপ্রার্থীরা তাদের জীবনবৃত্তান্ত সুন্দর এবং সঠিকভাবে তৈরী করার ব্যপারে গুরুত্ব প্রদান করে না ৷ চাকরির জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হলে সর্বদা খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে এটি যেন আকর্ষণীয় হয়। এতে যদি গুরুত্বর্পূ তথ্যঘাটতি থাকে কিংবা পাঠযোগ্য না হয় তাহলে চাকরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এ কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ রাখা উচিত জীবনবৃত্তান্ত বানানোর সময়।

আপনার জীবনবৃত্তান্ত তৈরীর আগে যে সকল বাস্তবতার দিকে নজর রাখবেন-

একজন চাকুরীদাতা গড়ে একটি জীবনবৃত্তান্ত (CV)- এর উপর ৩০ সেকেন্ডের বেশী সময় দেয় না ৷ সুতরাং এটি হতে হবে সংক্ষিপ্ত ৷ তথ্যগুলোর উপস্থাপন হতে হবে সুস্পষ্ট ৷ অপ্রয়োজনীয় বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিহার করতে হবে ৷

কিওয়ার্ড ব্যবহার করুন: প্রতিটি পেশায়ই কিছু নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়, যা অন্যান্য পেশা থেকে আলাদা। একইভাবে আপনি যে চাকরির জন্য আবেদন করছেন, তা কিছু নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ বিশেষ শব্দ বা কিওয়ার্ডগুলোর কিছু অন্তত আপনার চাকরির আবেদনে ব্যবহার করুন। এতে নিয়োগকর্তারা বুঝতে পারবেন আপনি সঠিক ব্যক্তি। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান এখন জীবনবৃত্তান্ত বাছাই করতে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতি ব্যবহার করছে। সে ক্ষেত্রে সঠিক কিওয়ার্ড ব্যবহার না করলে আপনি চাকরি পাবেন না।

চাহিদা অনুযায়ী জীবনবৃত্তান্ত: আপনি যদি একটি জীবনবৃত্তান্ত বানিয়ে সব চাকরিতে আবেদন করেন তাহলে ভুল করবেন। প্রত্যেক চাকরির জন্য নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। আপনি যে চাকরির জন্য আবেদন করছেন, সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যোগ্যতাগুলোই জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করুন। অন্য যোগ্যতাগুলো উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।

সঠিক বানান ও ব্যাকরণ: জীবনবৃত্তান্তে ভুল কোনো অবস্থায়ই কাম্য নয়। সামান্য বানান ভুল কিংবা ব্যাকরণগত ভুল যদি নিয়োগকর্তাদের চোখে পড়ে তাহলে আপনার চাকরি হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে।

সংখ্যা ব্যবহার: আপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সংখ্যার বিচারে প্রকাশ করুন। অন্যথায় বহু তথ্য দিলেও তা নিয়োগকর্তা ভাসা ভাসা মনে করতে পারে। যেমন—আপনি আগে একটি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিংয়ের দায়িত্বে থেকে বিক্রি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ তথ্যে অস্পষ্টতা থাকে। তবে আপনি যদি লেখেন, ১০ শতাংশ বিক্রি বাড়িয়েছিলেন তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

তথ্য জানান: আপনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জীবনবৃত্তান্তের শুরুতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জানানো প্রয়োজন। অন্যথায় আপনার বিষয়ে অন্ধকারেই থাকতে পারেন নিয়োগকর্তা। এসব তথ্যের মধ্যে আপনার অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও অর্জন অল্প কথায় তুলে ধরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পাঠযোগ্যতা: জীবনবৃত্তান্ত যদি এমনভাবে লেখা হয় যে নিয়োগকর্তা তা পড়তেই পারলেন না, তাহলে আপনার বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন নিয়োগকর্তা। এ কারণে আপনার জীবনবৃত্তান্তে ফন্ট সর্বদা পরিষ্কার হতে হবে। কোনো নকশা করা ফন্ট ব্যবহার চলবে না। লেখা যেন খুব ছোট কিংবা খুব বড় না হয়। ১২ থেকে ১৪ ফন্টের মধ্যে রাখুন। অল্প কিছু বুলেট পয়েন্ট ব্যবহার করতে পারেন, বেশি নয়। এক ইঞ্চি মার্জিন বামে বা জাস্টিফায়েড অ্যালাইনমেন্ট ও স্বাভাবিক মাপের কাগজ রাখুন।

এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি আপনার CV তে সঠিক তথ্য দিবেন ৷ এমন কোন তথ্য দিবেন না যা আপনার Job interview-তে ভুল প্রমানিত হতে পারে ৷

জীবনবৃত্তান্তের (CV) বিভিন্ন অংশ

একটি জীবনবৃত্তান্তে (CV) যে তথ্যগুলো আপনি সুবিন্যস্ত ভাবে উপস্থাপন করবেন সেগুলো হচ্ছে–

শিরোনাম (Title)
সার সংক্ষেপ (Career Summary) –> অভিজ্ঞতা সম্পন্নদের জন্য বেশী প্রয়োজন ৷
ক্যারিয়ার উদ্দেশ্য (Career objective)–>সদ্য পাশ করা চাকুরী প্রার্থীদের জন্য বেশী প্রয়োজন ৷
চাকুরির অভিজ্ঞতা (Experience)
শিক্ষাগত যোগ্যতা (Education)
অতিরিক্ত তথ্য (Additional Information)
ব্যক্তিগত তথ্য (Personal Information)
রেফারেন্স (Reference)

শিরোনাম: (Title): জীবনবৃত্তান্তের শুরুতেই থাকবে আপনার পুরো নাম ৷ এটা বোল্ড (bold) হবে এবং একটু বড় ফন্টে লিখতে হবে (ডাক নাম পরিহার করুন) ৷ তার পর থাকবে আপনার ঠিকানা (বর্তমান ঠিকানা যেখানে আপনাকে চিঠি দিলে আপনি পাবেন), ফোন নম্বর ও ই-মেইল এড্রেস ৷ এই অংশটুকু পৃষ্ঠার উপরে মধ্যখানে থাকবে, যাতে তা প্রথমেই চোখে পরে ৷

Career Summary( সার সংক্ষেপ ): যে সকল ব্যক্তিদের ৪-৫ বছরের বেশী চাকরীর অভিজ্ঞতা আছে তাদের জন্য এটি বেশী প্রযোজ্য ৷ এই অংশে আপনি সর্বোচ্চ ৬-৭ লাইনে উল্লেখ করুন আপনার পূর্ব চাকরীর অভিজ্ঞতার কর্মক্ষেত্রগুলো ৷ আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতার সাফল্যগুলো (Achievement) সংক্ষেপে তুলে ধরুন (যদি থাকে) ৷

Career Objective: এটি বেশী প্রযোজ্য সদ্য পাশ করা চাকুরী প্রার্থী বা অল্প অভিজ্ঞ (১ / ২ বছর) চাকুরী প্রার্থীদের জন্য ৷ এই অংশে আপনি আপনার চাকুরীক্ষেত্রে বর্তমান লক্ষ্য (Immediate goal) উল্লেখ করুন এবং আপনার যোগ্যতা কিভাবে বিজ্ঞপ্তির (Advertised) চাকুরী বা যে প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন, তার প্রয়োজন মেটাতে পারে তার প্রেক্ষিতে উপস্থাপন করুন ৷ চাকুরীর জন্য উপযুক্ত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষিপ্তভাবে উলেখ করুন ৷ চাকুরী বিজ্ঞপ্তি বা কোম্পানির প্রয়োজনের সাথে খাপ খাইয়ে Career Objective লেখা জরুরী ৷ আপনি কোম্পানিকে কি দিতে পারবেন তার ওপর গুরুত্বারোপ করুন, কোম্পানির কাছ থেকে আপনি কি আশা করছেন তার ওপর নয় ৷

Experience: (কর্ম অভিজ্ঞতা): অভিজ্ঞ পেশাজীবিদের জন্য এই অংশটি শিক্ষাগত যোগ্যতার আগেই আসা উচিত ৷ সদ্য পাশ করা বা অল্প অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে আগে শিক্ষাগত যোগ্যতা (Education) এবং তার পরে experience আসা উচিত ৷

 

যে সকল তথ্য আপনার প্রতিটি পূর্ব অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে উল্লেখ করবেন সেগুলো হচ্ছে,

* Organization name (প্রতিষ্ঠানের নাম)
* Designation (পদবী)
* Time period- From & To (সময়কাল)
* Job responsibility (দায়িত্ব)
* Special achievement (উল্লেখযোগ্য সাফল্য)

আপনি যদি একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদে কাজ করে থাকেন, তাহলে আলাদা আলাদা ভাবে তা উল্লেখ করুন ৷

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনি প্রথমেই উল্লেখ করবেন আপনার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা (most recent experience), তার পরে এক এক করে Resume Chronological Order-এ একটির পর একটি অভিজ্ঞতা উল্লেখ করবেন যা শেষ হবে আপনার সর্বপ্রথম অভিজ্ঞতা দিয়ে ৷

আপনার খুব কম গুরুত্বপূর্ণ বা কম সময়ের অভিজ্ঞতা উল্লেখ না করাই ভাল ৷ তবে লক্ষ্য রাখবেন যে আপনার List of experience এর মধ্যে যাতে খুব বেশী Time gap না থাকে ৷

Education & Training (শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ): আগেই বলা হয়েছে যে এই অংশটি সদ্য পাশ করা বা অল্প অভিজ্ঞদের জন্য Experience অংশের আগেই আসা উচিত্ ৷ Education অংশে আপনি আপনার ডিগ্রিগুলোর নাম উল্লেখ করবেন এবং নিম্নেবর্ণিত তথ্য প্রদান করবেন ৷

* ডিগ্রির নাম (যেমন: SSC, HSC, BCom)
* কোর্স সময়কাল (কবে থেকে কবে)
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বোর্ডের নাম ৷
* পরীক্ষার বছর এবং প্রয়োজনে ফলাফল প্রকাশের সময় ৷
* ফলাফল/Result এবং যদি উল্লেখযোগ্য সাফল্য (যেমন: মেধাতালিকায় স্থান) থাকে তবে তার উল্লেখ করতে হবে ৷

লক্ষ্য রাখবেন আপনার কোন ডিগ্রির চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ না হয়ে থাকলে সেই ডিগ্রির উল্লেখ করার সময় ব্র্যাকেটে ‘Appeared’ উল্লেখ করবেন ৷ কোন কোর্সে অধ্যায়নরত থাকলে ‘Ongoing’ উল্লেখ করুন ৷ কোন ডিগ্রির ক্ষেত্রে আপনার Result যদি খুব খারাপ হয়ে থাকে তবে কোন Result-ই উল্লেখ করার দরকার নেই ৷ মনে রাখবেন একটি ডিগ্রির ফলাফল উল্লেখ করা ও অন্যটি উল্লেখ না করা দৃষ্টিকটু ৷

আপনি যদি কোন বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং যদি তা আপনার কাজের যোগ্যতার সহায়ক বলে মনে করেন তবে তা উল্লেখ করবেন ৷ সেক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, Topics, প্রতিষ্ঠানের সময় (Duration) তারিখ উল্লেখ করবেন ৷
প্রশিক্ষণের তালিকা আপনি Education অংশের নীচে দিতে পারেন ৷

অতিরিক্ত তথ্য / Additional Information:

যে সকল তথ্য উপরে উল্লেখিত অংশগুলোর মধ্যে পড়ে না কিন্তু চাকরির সাথে সম্পর্কিত তা এ বিভাগে বর্ণনা করুন ৷

* পেশাগত অর্জন / Professional Achievement
* পদক/ সম্মাননা/ Award.
* ভাষাগত দক্ষতা / Language Literacy
* কম্পিউটারে দক্ষতা / Computer Skills.
* লাইসেন্স,সরকারি পরিচয়পত্র, প্রকাশিত লেখা ও সত্বাধিকার
* স্বেচ্ছাসেবী কর্মকান্ড ইত্যাদি

ব্যক্তিগত তথ্য / Personal Information: এই অংশে পিতামাতা, বর্তমান/স্থায়ী ঠিকানা, ধর্ম, যে সকল দেশ আপনি ভ্রমণ করেছেন, শখ ইত্যাদি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ৷

রেফারেন্স (Reference): খেয়াল রাখবেন Reference অংশে আপনি আপনার নিকট আত্মীয়দের নাম উল্লেখ করবেন না ৷ আপনাকে আপনার ছাত্র জীবনে বা কর্মজীবনে কাছ থেকে দেখেছে এমন ব্যক্তিকেই আপনি Reference হিসাবে উল্লেখ করবেন ৷ অবশ্যই যাদেরকে Reference দিবেন তাদের ফোন নাম্বার, ঠিকানা এবং ই-মেইল (যদি থাকে) উল্লেখ করবেন ৷ সাধারণত Reference হিসাবে সর্বোচ্চ ২-৩ জনের নাম উল্লেখ করাই শ্রেয় ৷ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারের দিকে খেয়াল রাখতে হবে তা হচ্ছে আপনি যাদেরকে Reference হিসাবে উল্লেখ করেছেন সে সকল ব্যাক্তিকে আপনার আগে থেকে জানাতে হবে যে আপনি তাদের Reference হিসাবে আপনার জীবনবৃত্তান্ত (CV)- তে উল্লেখ করেছেন ৷

প্রয়োজন অনুযায়ী আকার : জীবনবৃত্তান্ত বড় নাকি ছোট হবে, তা নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে যান। আপনার যদি অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বেশি থাকে তাহলে স্বভাবতই জীবনবৃত্তান্ত বড় হবে। সে ক্ষেত্রে একাধিক পাতায়ও কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বা বাড়তি কথা লিখে তা বড় করা যাবে না।

বিজনেস ইনসাইডার ও বিডি জবস অবলম্বনে এস এম মাহ্দী